ব্যাকুলতাই আত্মসাক্ষাতের পথ।
ব্যাকুলতাই আত্মসাক্ষাতের পথ—এই একটি বাক্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে মানুষের সমগ্র সাধনার মানচিত্র, কারণ যেখানে ব্যাকুলতা নেই সেখানে অনুসন্ধান নেই, আর যেখানে অনুসন্ধান নেই সেখানে ঈশ্বরলাভ কেবল শব্দমাত্র। শ্রী রামকৃষ্ণ বারবার বলতেন, ঈশ্বরকে পাওয়া যায় না কেবল জ্ঞান দিয়ে, যুক্তি দিয়ে বা আচার দিয়ে—ঈশ্বরকে পাওয়া যায় হৃদয়ের গভীর ব্যাকুলতা দিয়ে। যেমন শিশুটি মায়ের জন্য কাঁদে, তার কান্নায় কোনও হিসেব নেই, কোনও শর্ত নেই, তেমনই যে মানুষ দিনরাত ঈশ্বরচিন্তায় ডুবে থাকে, তার জীবন ধীরে ধীরে ঈশ্বরের স্বভাবেই রূপান্তরিত হয়। ঈশ্বরচিন্তা তখন আর আলাদা কোনও কাজ থাকে না—খাওয়া, চলা, শ্বাস নেওয়া, দুঃখ-সুখ সবকিছুই হয়ে ওঠে ঈশ্বরমুখী। দিনের আলোয় যেমন সূর্যকে আলাদা করে দেখতে হয় না, তেমনি জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে ঈশ্বরচিন্তা স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। ব্যাকুল হৃদয় হিসেব কষে না—সে প্রশ্ন করে না “কবে পাব”, “কীভাবে পাব”; সে শুধু জানে, না পেলে সে বাঁচতে পারবে না। এই ব্যাকুলতা আসলে কোনও আবেগী দুর্বলতা নয়, এ হল আত্মার গভীর স্মৃতি—যে স্মৃতি জানে, ঈশ্বরই তার প্রকৃত ঘর। মানুষ যত বেশি ঈশ্বরচিন্তায় ডুবে যায়, ততই তার অহংকার ক্ষয়ে যায়, কামনা-বাসনা আলগা হয়ে পড়ে, আর মন স্বচ্ছ জলের মতো শান্ত হয়ে ওঠে। তখন আর আলাদা করে সাধনা করতে হয় না—জীবনটাই সাধনা হয়ে যায়। শ্রী রামকৃষ্ণ বলতেন, যেমন নুন জলে মিশে গেলে আলাদা করে নুন খুঁজে পাওয়া যায় না, তেমনই ঈশ্বরচিন্তায় ডুবে গেলে মানুষ আর নিজেকে আলাদা করে অনুভব করে না; সে হয়ে ওঠে করুণাময়, সহিষ্ণু, নির্ভয়। ঈশ্বরের স্বভাব মানে কেবল অলৌকিক ক্ষমতা নয়—ঈশ্বরের স্বভাব মানে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, সীমাহীন ক্ষমা, গভীর শান্তি। দিনরাত ঈশ্বরচিন্তার ফলেই এই গুণগুলো ধীরে ধীরে মানুষের চরিত্রে প্রকাশ পায়। তখন দুঃখ এলেও সে ভেঙে পড়ে না, অপমান এলেও সে প্রতিহিংসায় জ্বলে ওঠে না, কারণ তার ভিতরে এক অবিচল আশ্রয় তৈরি হয়ে গেছে। ব্যাকুলতা মানুষকে শূন্য করে না—ব্যাকুলতা মানুষকে পূর্ণ করে। যে ব্যাকুল, সে জানে এই জগতের কোনও বস্তুই তাকে তৃপ্ত করতে পারবে না; তাই তার চোখ থাকে একমাত্র ঈশ্বরের দিকে। এই দৃষ্টিই আসলে আত্মসাক্ষাতের সূচনা। ধীরে ধীরে মানুষ বুঝতে শেখে, ঈশ্বর বাইরে কোথাও নেই—তিনি তার নিজের অন্তরের গভীরে। আর এই উপলব্ধির পথ একটাই—অটুট, নিরন্তর, নিঃশর্ত ঈশ্বরচিন্তা। তাই শ্রী রামকৃষ্ণের বাণী আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয়, যদি সত্যিই ঈশ্বরকে জানতে চাও, তবে ব্যাকুল হও; কারণ ব্যাকুল হৃদয়ই শেষ পর্যন্ত ঈশ্বরের দরজায় পৌঁছায়, আর সেই দরজা খুললেই মানুষ নিজের সত্য স্বরূপের মুখোমুখি হয়।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন