উপরের বাণীতে শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস মানুষের অন্তরের এক গভীর সত্য তুলে ধরেছেন। অহংকার যখন মানুষের মনে জমে ওঠে, তখন তা ধীরে ধীরে এক কালো মেঘের মতো মনকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। বাইরে যতই আলো থাকুক না কেন, এই মেঘ সূর্যের আলোকে ঢুকতে দেয় না। ঠিক তেমনই, অহংকার মানুষের অন্তরে থাকা ঈশ্বরচেতনাকে আড়াল করে দেয়। মানুষ অনেক সময় ঈশ্বরকে বাইরে খুঁজতে ব্যস্ত থাকে—মন্দিরে, তীর্থে কিংবা নানা আচার-অনুষ্ঠানে। কিন্তু শ্রী রামকৃষ্ণ আমাদের মনে করিয়ে দেন যে ঈশ্বর মানুষের নিজের মধ্যেই অবস্থান করেন। সমস্যা ঈশ্বরের অনুপস্থিতি নয়, সমস্যা হলো আমাদের অহংকারের ভার। এই অহংকার মানুষকে নিজের ভুল স্বীকার করতে দেয় না, অন্যের কথা শুনতে দেয় না, আর বিনয়ের পথ থেকেও দূরে সরিয়ে দেয়। দৈনন্দিন জীবনে অহংকারের প্রকাশ খুব সূক্ষ্মভাবে ঘটে। নিজের মতকেই একমাত্র সত্য মনে করা, অন্যকে ছোট করে দেখা, কিংবা নিজের সাফল্যকেই সবকিছুর কেন্দ্র ভাবা—এসবই অহংকারের রূপ। যতদিন এই অভ্যাসগুলো মনকে আচ্ছন্ন করে রাখে, ততদিন মানুষের মনে প্রকৃত শান্তি আসে না। আর শান্তি ছাড়া ঈশ্বর উপলব্ধি অসম্ভব। শ্রী রামকৃষ্ণের এই বাণীর মূল শিক্ষা হলো—ঈশ্বরকে পাওয়ার জন্য নতুন...
“হে প্রভু, আমি তোমার প্রকৃত স্বরূপ জানি না। হে মহাদেব, তোমার যে-রূপই হোক, সেই রূপকেই আমি বারংবার প্রণাম জানাই।” এই প্রার্থনার মধ্যে কোনো দাবি নেই, কোনো শর্ত নেই—আছে শুধু এক গভীর আত্মসমর্পণ। মানুষ চায় সংজ্ঞা, চায় রূপ, চায় নাম। কিন্তু ঈশ্বর কি কেবল সংজ্ঞায় ধরা দেন? না কি তিনি সব সংজ্ঞার ঊর্ধ্বে—যেখানে ভাষা থেমে যায়, মন নীরব হয়ে আসে? মহাদেব সেই অনন্ত সত্য, যাঁকে এক নামে বাঁধা যায় না। কখনো তিনি ধ্যানমগ্ন যোগী—চোখ বন্ধ, জগতের সব শব্দ স্তব্ধ। আবার কখনো তিনি তাণ্ডবের নটরাজ—যাঁর নৃত্যে সৃষ্টি ও লয় একসাথে ঘটে। কখনো তিনি শিব—মঙ্গলময়, শান্ত; আবার কখনো ভৈরব—ভয়ংকর অথচ করুণায় পূর্ণ। এই দ্বৈততা নয়, এই হলো পূর্ণতা। মানুষ যখন বলে—“আমি তোমার প্রকৃত স্বরূপ জানি না”—তখন সে আসলে নিজের সীমাবদ্ধতাকেই স্বীকার করে নেয়। এই স্বীকারোক্তিই ভক্তির প্রথম ধাপ। কারণ অহংকার ভেঙে গেলে তবেই হৃদয়ে ঈশ্বরের প্রবেশ ঘটে। আমরা অনেক সময় বলি, “আমার ঈশ্বর এমন”, “আমার বিশ্বাস ওরকম”—কিন্তু সত্যিকারের ভক্তি বলে, “তুমি যেমন, আমি তেমনই মেনে নিই।” মহাদেব কোনো নির্দিষ্ট রূপে আবদ্ধ নন। তিনি শূন্যেও আছেন, পূর্ণতাতেও আছেন। তিনি...
শেখা—মানুষের জীবনের এমন এক সম্পদ, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষয় হয় না, বরং আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। মানুষ জীবনে বহু কিছু অর্জন করে—অর্থ, প্রতিষ্ঠা, সামাজিক মর্যাদা, ক্ষমতা। কিন্তু এই সবই পরিস্থিতির সঙ্গে বদলে যেতে পারে। আজ যা আছে, কাল তা নাও থাকতে পারে। ঠিক এই বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েই স্বামী বিবেকানন্দ দৃঢ় কণ্ঠে বলেছিলেন— “শেখাই একমাত্র সম্পদ—যা কোনোদিন ব্যর্থ হয় না।” এই বাণী কেবল একটি উক্তি নয়; এটি জীবনের জন্য এক চিরস্থায়ী দিশা। শিক্ষা শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান নয়। প্রকৃত শিক্ষা মানুষের চিন্তাকে শাণিত করে, দৃষ্টিকে প্রসারিত করে এবং চরিত্রকে দৃঢ় করে। যে মানুষ শেখে, সে কেবল তথ্য সংগ্রহ করে না—সে জীবনকে বুঝতে শেখে। জীবনের প্রতিটি অভিজ্ঞতা, সুখ-দুঃখ, সাফল্য-ব্যর্থতা—সবই তার কাছে হয়ে ওঠে নতুন শিক্ষার উপাদান। এই কারণেই শেখা কখনো ব্যর্থ হয় না; কারণ প্রতিটি পরিস্থিতিতেই তা কোনো না কোনোভাবে কাজে আসে। স্বামী বিবেকানন্দ বিশ্বাস করতেন, মানুষের ভেতরে অসীম শক্তি নিহিত রয়েছে। শিক্ষা সেই শক্তিকে জাগ্রত করে। অশিক্ষা মানুষকে দুর্বল করে, আর শিক্ষা মানুষকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। যে ব্যক্তি শ...
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন