কর্তব্য কী? — কর্মযোগের আলোকে জীবনের প্রকৃত দিশা।
কর্মযোগের তত্ত্ব বুঝতে হলে সর্বপ্রথম যে প্রশ্নটির মুখোমুখি হতে হয়, তা হলো—কর্তব্য কী? মানুষ কিছু করতে চায়, কিছু করতে হয়, কিন্তু সেই কাজটি কেন করবে, এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে কর্তব্যের ধারণার মধ্যে। কর্তব্য কোনো একটিমাত্র গ্রন্থের নির্দিষ্ট বিধান নয়, আবার কোনো একটি জাতি বা কালের মধ্যেও সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের জীবন, পরিবেশ, সংস্কার, সমাজ ও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কর্তব্যের রূপ বদলে যায়। এই কারণেই কর্তব্যের একটি সার্বজনীন ও চূড়ান্ত সংজ্ঞা দেওয়া প্রায় অসম্ভব।
ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখি—এক জাতির কাছে যা কর্তব্য, অন্য জাতির কাছে তা নাও হতে পারে। ধর্ম, সংস্কার ও সামাজিক গঠন মানুষের কর্তব্যবোধকে গড়ে তোলে। কিন্তু শুধু কী কাজ করা হয়েছে, তার উপর ভিত্তি করে কোনো কর্মকে কর্তব্য বলা যায় না। একই কাজ ভিন্ন পরিস্থিতিতে ভিন্ন অর্থ বহন করে। তাই কর্তব্য নির্ধারণের প্রকৃত মাপকাঠি বাইরের নয়, অন্তরের।
অধ্যাত্মের দৃষ্টিতে বিচার করলে দেখা যায়—যে কর্ম মানুষকে উন্নতির দিকে নিয়ে যায়, যা তাকে আরও সংযত, উদার ও সচেতন করে তোলে, সেই কর্মই সৎ। আর যে কর্ম মানুষকে নীচের দিকে টানে, তাকে পশুভাবাপন্ন করে, সেটিই অসৎ। এই উন্নতি বাহ্যিক সাফল্যের মধ্যে নয়, অন্তরের রূপান্তরের মধ্যে নিহিত। সুখ ও দুঃখ—উভয়ই এই রূপান্তরের শিক্ষক। এই অভিজ্ঞতাগুলির ছাপই মানুষের মনে সংস্কার হিসেবে জমা হয়, আর সেই সংস্কারগুলির সমষ্টিকেই আমরা চরিত্র বলি।
ভগবদ্গীতা বারবার মানুষের জন্মগত অবস্থা ও সামাজিক অবস্থান অনুযায়ী কর্তব্য পালনের কথা বলেছেন। অর্থাৎ, মানুষ যে পরিবেশে জন্মেছে, যে দায়িত্ব তার কাঁধে এসেছে—সেই ক্ষেত্র থেকেই তার সাধনার শুরু। নিজের হাতে যে কাজটি এখন রয়েছে, সেটিকে অবহেলা করে দূরের কোনো কল্পিত আদর্শের দিকে ছুটলে প্রকৃত উন্নতি হয় না। বরং বর্তমান কর্তব্যকে নিঃস্বার্থভাবে ও অনাসক্তভাবে পালন করাই কর্মযোগের আসল শিক্ষা।
নিঃস্বার্থ কর্ম মানে নিজের লাভ বা স্বীকৃতির কথা না ভেবে কাজ করা। অনাসক্তি মানে কাজের প্রতি উদাসীন হওয়া নয়, বরং সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে কাজ করা, কিন্তু তার ফলকে নিজের অহংকারের সঙ্গে জড়িয়ে না ফেলা। এই দুই গুণ একসঙ্গে থাকলেই কর্ম ধীরে ধীরে উপাসনায় রূপ নেয়। তখন কর্ম আর বোঝা থাকে না, তা হয়ে ওঠে আত্মশুদ্ধির পথ।
কর্তব্য বড় বা ছোট হয় না। সমাজে কেউ উচ্চ পদে, কেউ নীচু পদে—কিন্তু কর্তব্যের মহত্ত্ব নির্ধারিত হয় কীভাবে সেই কাজটি করা হচ্ছে, তার দ্বারা। যে ব্যক্তি নিজের অবস্থান অনুযায়ী আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কর্তব্য পালন করে, সে ধীরে ধীরে শক্তি সঞ্চয় করে এবং জীবনের উচ্চতর স্তরে পৌঁছবার যোগ্য হয়ে ওঠে। প্রকৃতি নিজেই মানুষকে তার উপযুক্ত স্থানে নিয়ে যায়।
কর্তব্য সবসময় সহজ বা রুচিকর হয় না। সেখানে সংঘর্ষ, ত্যাগ ও সহনশীলতার প্রয়োজন হয়। কিন্তু প্রেম কর্তব্যকে সহজ করে তোলে। নিঃস্বার্থ প্রেম ও আত্মসংযম থেকেই ধর্মের বিকাশ ঘটে। স্বার্থপরতা ও ইন্দ্রিয়পরতা মানুষকে অধঃপাতে নিয়ে যায়, আর কর্তব্যবোধ মানুষকে মুক্তির পথে এগিয়ে দেয়।
অতএব, জীবনের প্রকৃত আলোক লাভের একমাত্র পথ হলো—নিজের নিকটবর্তী কর্তব্যকে অবহেলা না করে, সম্পূর্ণ আন্তরিকতা ও অনাসক্তির সঙ্গে তা পালন করা। এই ধারাবাহিক সাধনাতেই ধীরে ধীরে মানুষ নিজের সত্য স্বরূপকে আবিষ্কার
করে।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন