নিত্য সাধনার প্রয়োজনীয়তা: নামগুণগান, প্রার্থনা ও বিবেক-বৈরাগ্যের শিক্ষা।
শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব আমাদের আধ্যাত্মিক জীবনের যে গভীর সত্যটি বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, তা হল—সাধনা কোনো একদিনের কাজ নয়, এটি নিত্যদিনের অভ্যাস। তিনি বলেন, “সর্বদাই তাঁর নামগুণগান-কীর্তন, প্রার্থনা করতে হয়। পুরাতন ঘটি রোজ মাজতে হবে, একবার মাজলে কি হবে?”—এই উপমার মধ্যেই লুকিয়ে আছে মানবজীবনের এক চিরন্তন সত্য। যেমন একটি পুরনো পিতলের ঘটি প্রতিদিন ব্যবহার করতে গেলে নিয়মিত মাজতে হয়, না হলে তাতে ময়লা জমে,
ঠিক তেমনই মানুষের মনও প্রতিদিন সংসারের ধুলোয় আবৃত হয়। একদিন প্রার্থনা করলেই মন চিরদিনের জন্য নির্মল হয়ে যাবে—এমন ভাবনা ভ্রান্ত। মনকে শুদ্ধ রাখতে হলে নিয়মিত ঈশ্বরস্মরণ, নামজপ, কীর্তন ও প্রার্থনার প্রয়োজন। এই সাধনাই ধীরে ধীরে মানুষের অন্তরে বিবেক ও বৈরাগ্যের বোধ জাগিয়ে তোলে। বিবেক আমাদের শেখায় কী নিত্য আর কী অনিত্য, কী সত্য আর কী মায়া। আর বৈরাগ্য আসে তখনই, যখন মানুষ উপলব্ধি করে যে সংসারের সুখ-দুঃখ, লাভ-ক্ষতি, সম্মান-অপমান—সবই ক্ষণস্থায়ী। শ্রীরামকৃষ্ণ সংসার ত্যাগ করতে বলেননি, কিন্তু তিনি সংসারের আসক্তি ত্যাগ করতে বলেছেন। সংসারকে কর্তব্যরূপে গ্রহণ করে ঈশ্বরকে জীবনের কেন্দ্রস্থলে স্থাপন করাই তাঁর শিক্ষার মূল কথা। প্রার্থনার মাধ্যমে মানুষ নিজের দুর্বলতা স্বীকার করে, অহংকার ভাঙে এবং ঈশ্বরের কৃপায় নিজেকে সমর্পণ করে। নামগুণগান-কীর্তন মনকে আনন্দিত করে, হৃদয়কে কোমল করে এবং চিত্তকে একাগ্র করে তোলে। এই একাগ্র চিত্তেই জন্ম নেয় গভীর আধ্যাত্মিক উপলব্ধি। কিন্তু যদি এই সাধনা অনিয়মিত হয়, যদি আমরা ভাবি—আজ নয়, কাল করব—তাহলে ধীরে ধীরে মন আবার পুরনো অভ্যাসে ফিরে যায়। তাই শ্রীরামকৃষ্ণের বাণী আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আধ্যাত্মিক জীবনে শৈথিল্যের কোনো স্থান নেই। প্রতিদিন একটু একটু করে ঈশ্বরস্মরণই জীবনের প্রকৃত পাথেয়। সংসার অনিত্য—এই বোধ যখন গভীর হয়, তখন মানুষের জীবনে শান্তি আসে, ভয় কমে, লোভ ক্ষীণ হয়। তখন আর বাহ্যিক সাফল্য বা ব্যর্থতা মানুষকে সহজে বিচলিত করতে পারে না। এইভাবেই নিত্য সাধনার মাধ্যমে ধীরে ধীরে মানুষের অন্তরে ঈশ্বরপ্রেমের বীজ অঙ্কুরিত হয় এবং জীবন হয়ে ওঠে অর্থবহ, শান্ত ও আলোকিত।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন