“ঈশ্বর আমাদের একান্ত আপন” — শ্রীমা সারদা দেবীর অনন্ত বাণী
“ঈশ্বর আমাদের একান্ত আপন”—এই ছোট অথচ গভীর বাণীটির মধ্যে যেন সমগ্র আধ্যাত্মিক জীবনের সার লুকিয়ে আছে। সারদা দেবী, যাঁকে আমরা শ্রীশ্রীমা নামে জানি, তাঁর কথায় কখনো দার্শনিক জটিলতা নেই, আছে মায়ের মতো সহজ, স্নিগ্ধ এবং আশ্রয়দায়ক সত্য। এই বাণী আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ঈশ্বর দূরে কোথাও নন, তিনি ভয় বা ভক্তির ভারী আবরণের আড়ালে লুকিয়ে নেই,
তিনি আমাদের জীবনের একেবারে আপন সত্তা।
মানুষ সাধারণত ঈশ্বরকে ভাবতে ভালোবাসে আকাশের অনেক ওপরে, অচেনা, কঠোর কোনো শক্তি হিসেবে। কিন্তু শ্রীমা সেই ধারণাকেই ভেঙে দেন। তিনি বলেন, ঈশ্বর আমাদের নিজেরই—যেমন মা, যেমন আপনজন। এই উপলব্ধি হলে ভয় থাকে না, থাকে না সংকোচ। তখন প্রার্থনাও আর মুখস্থ শব্দের খাঁচায় বন্দি থাকে না; তা হয়ে ওঠে হৃদয়ের সহজ ডাক।
এই বাণী বিশেষ করে সংসারী মানুষের জন্য অমূল্য। দৈনন্দিন জীবনের ক্লান্তি, দুঃখ, ব্যর্থতা, অপরাধবোধ—সবকিছু নিয়ে যখন মানুষ ঈশ্বরের কাছে যেতে ভয় পায়, তখন শ্রীমার এই কথাটি আশ্বাস দেয়। ঈশ্বর যদি একান্ত আপন হন, তবে তাঁর কাছে যাওয়ার জন্য আলাদা যোগ্যতা লাগে না। যেমন শিশু তার মায়ের কাছে কাঁদতে কাঁদতে চলে যায়, তেমনি মানুষও তার দুর্বলতা নিয়ে ঈশ্বরের কাছে যেতে পারে।
শ্রীমার আধ্যাত্মিকতা কখনো কঠোর সাধনার নির্দেশ দেয় না, বরং আত্মসমর্পণের কথা বলে। ঈশ্বরকে আপন ভাবতে পারাই সবচেয়ে বড় সাধনা। এই আপন ভাব তৈরি হলে ধ্যান সহজ হয়, নামজপে প্রাণ আসে, আর জীবনের প্রতিটি কাজই হয়ে ওঠে পূজার অঙ্গ।
এই বাণী আমাদের সম্পর্কের দৃষ্টিভঙ্গিও বদলে দেয়। যখন ঈশ্বর আমাদের আপন হন, তখন সব মানুষের মধ্যেও আমরা সেই আপন সত্তারই প্রকাশ দেখতে শুরু করি। তখন ঘৃণা কমে, অহংকার গলে, ক্ষমা সহজ হয়। আধ্যাত্মিকতা আর আলাদা কোনো জগতের বিষয় থাকে না—তা মিশে যায় দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে।
আজকের অস্থির সময়ে, যখন মানুষ নিরাপত্তাহীনতা ও একাকীত্বে ভুগছে, তখন শ্রীমার এই বাক্য যেন এক নীরব আশ্রয়। এটি মনে করিয়ে দেয়—তুমি একা নও। যাকে তুমি খুঁজছো বাইরে, তিনি তোমারই। ঈশ্বর কোনো দূরের লক্ষ্য নন, তিনি হৃদয়ের অন্তঃস্থলেই বিরাজমান।
শ্রীমা সারদা দেবীর এই বাণী তাই শুধু পড়ার নয়, জীবনে ধারণ করার মতো। যদি আমরা প্রতিদিন একটু করে ঈশ্বরকে “আপন” ভাবতে শিখি, তবে আমাদের প্রার্থনা বদলাবে, মন বদলাবে, আর ধীরে ধীরে জীবনও বদলে যাবে। কারণ ঈশ্বর যখন একান্ত আপন হয়ে ওঠেন, তখন জীবন আর ভার নয়—তা হয়ে ওঠে বিশ্বাসের সহজ প্রবাহ।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন