মণিকর্ণিকায় শিবদর্শন ও সোনার অন্নপূর্ণা—ভাবসমাধির এক অমৃত মুহূর্ত
সেজোবাবুর সঙ্গে যখন কাশী গিয়েছিলাম, তখন মণিকর্ণিকা ঘাটের কাছ দিয়ে আমাদের নৌকা ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছিল। চারদিকে মৃত্যুর নীরবতা, ধোঁয়া, মন্ত্রধ্বনি আর অনন্তের উপস্থিতি—কাশীর সেই চিরন্তন আবহ। হঠাৎই এক আশ্চর্য মুহূর্ত নেমে এল অন্তরে—শিবদর্শন। কোনো রূপ নয়, কোনো নাম নয়—তবু নিশ্চিত অনুভব। আমি নৌকার ধারে এসে দাঁড়ালাম, আর মুহূর্তের মধ্যেই মন সমাধিস্থ হয়ে গেল।
শরীর তখন যেন নেই—সময় নেই—স্থান নেই। মাঝিরা ভয় পেয়ে আমার দিকে তাকিয়ে হৃদেকে বলতে লাগল,
“ধর! ধর! পড়ে যাবে না তো?”
কিন্তু আমি তখন আর এই জগতের মধ্যে ছিলাম না। মনে হচ্ছিল—জগতের যত গাম্ভীর্য, যত গভীর নীরবতা, যত ভয় ও যত মুক্তি—সব একত্র হয়ে সেই মণিকর্ণিকা ঘাটে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি কেউ নন, আবার তিনিই সব।
প্রথমে দেখলাম—তিনি দূরে দাঁড়িয়ে আছেন। কোনো বিশেষ আকৃতি নেই, তবু উপস্থিতি স্পষ্ট। তারপর দেখলাম—তিনি ধীরে ধীরে কাছে আসছেন। আর পরক্ষণেই—তিনি আর বাইরে নেই, তিনি আমার ভিতরেই মিলিয়ে গেলেন। বাহির ও ভিতরের ভেদ ভেঙে গেল। দর্শক ও দর্শনের পার্থক্য লুপ্ত হল। তখন আর ‘আমি’ নেই—শুধু ভাব।
এই ভাবের মধ্যেই দেখলাম—এক সন্ন্যাসী আমার হাত ধরে নিয়ে যাচ্ছেন। কোথায় যাচ্ছি জানি না, জানতে চাইও না। শুধু অনুভব করছি—এক অদৃশ্য আশ্রয়, এক অপার স্নেহ। আমরা একটি ঠাকুরবাড়িতে প্রবেশ করলাম। সেই ঘর আলোয় ভরা, কিন্তু সে আলো চোখের নয়—অন্তরের।
সেইখানেই হল সোনার অন্নপূর্ণা দর্শন। কোনো অলংকারের চাকচিক্য নয়, কোনো বাহ্য আড়ম্বর নয়—তবু ‘সোনা’ বললে যা বোঝায়, তার চেয়েও গভীর এক ঐশ্বর্য। মনে হল—যিনি সকলকে অন্ন দেন, যিনি শূন্যকেও পূর্ণ করেন, তিনিই মায়ের রূপে দাঁড়িয়ে আছেন। সেই দর্শনে ভয় নেই, আকাঙ্ক্ষা নেই—আছে শুধু তৃপ্তি ও আত্মসমর্পণ।
এই অভিজ্ঞতা কোনো যুক্তিতে ধরা পড়ে না। এটি কল্পনা নয়, আবার সাধারণ দেখাও নয়। এটি ভাবের সত্য, যেখানে মন নিজেকে হারিয়ে ফেলে, আর ঈশ্বর নিজেকে প্রকাশ করেন। কাশীর মণিকর্ণিকা ঘাট—যেখানে মানুষ মৃত্যু দেখতে যায়—সেখানেই জীবনের চরম সত্য ধরা দেয়। সেখানে শিব মৃত্যু নন, তিনি মহাজীবন। আর অন্নপূর্ণা শুধু অন্নদাত্রী নন—তিনি চেতনার পূর্ণতা।
এই ভাবকথা আমাদের শেখায়—ঈশ্বরকে খুঁজতে দূরে যেতে হয় না। যখন মন সম্পূর্ণ নীরব হয়, যখন ‘আমি’ ভেঙে যায়, তখনই তিনি কাছে আসেন। কখনো ঘাটে দাঁড়িয়ে, কখনো অন্তরের গভীরে মিলি
য়ে গিয়ে।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন