শুধু পরমাত্মাই অচল — মায়ার জগতে কেন সবকিছু বুদ্ধিতে ধরা যায় না

Sri Ramakrishna teaches that only Paramatma is unchanging, beyond sorrow and joy, while maya cannot be fully understood.

Sri Ramakrishna spiritual teaching about Paramatma, maya, and faith beyond human understanding

 শ্রীশ্রীঠাকুরের বাণীর মধ্যে এমন এক আশ্চর্য সরলতা আছে, যা প্রথমে শুনতে সহজ মনে হলেও অন্তরে প্রবেশ করলে গভীর এক জাগরণ ঘটায়। তিনি বলতেন— শুধু পরমাত্মাই অচল, নির্লিপ্ত, সুখ-দুঃখাতীত; আর এই জগত, যা আমরা প্রতিদিন দেখি, অনুভব করি, আঁকড়ে ধরতে চাই, তা মায়ার মধ্যে আবৃত। মানুষের মন প্রতিনিয়ত সবকিছুকে যুক্তি দিয়ে ধরতে চায়, কারণ বুদ্ধি সবকিছুর ব্যাখ্যা খোঁজে। কিন্তু এমন বহু ঘটনা আছে জীবনে, যা কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই ঘটে যায়— কখনো সুখ এসে দাঁড়ায় অপ্রত্যাশিতভাবে, কখনো দুঃখ এসে হৃদয়কে ভারী করে দেয়। তখন মানুষ ভাবে, কেন এমন হলো? কী কারণে হলো? অথচ শ্রীশ্রীঠাকুরের শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মায়ার জগতে সবকিছু মানববুদ্ধির সীমার মধ্যে আসে না, কারণ এই জগতের অন্তরালে এক গভীরতর ইচ্ছা কাজ করছে, যা আমাদের চোখে ধরা পড়ে না।

আমরা সাধারণত যা দেখি, তাই সত্য বলে ধরে নিই। কারও সাফল্য দেখে মনে হয়, তার জীবন নিশ্চয়ই পূর্ণ; কারও কষ্ট দেখে মনে হয়, সে বুঝি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। কিন্তু অন্তরের বাস্তবতা অনেক সময় সম্পূর্ণ আলাদা। বাইরের পরিবর্তন, সম্পর্কের ওঠানামা, প্রাপ্তি ও অপূর্ণতা— সবকিছুই চলমান। আজ যা আছে, কাল তা নাও থাকতে পারে। এই পরিবর্তনের ভেতর দাঁড়িয়ে মানুষ স্থায়িত্ব খোঁজে, নিরাপত্তা খোঁজে, এবং সেই খোঁজেই ক্লান্ত হয়ে পড়ে। শ্রীশ্রীঠাকুর যেন আমাদের স্নেহের সঙ্গে বলেন— যে অচল, তা বাইরে নয়; ভেতরে। যে নির্লিপ্ত, তা কোনো পরিস্থিতির দাস নয়। যে সুখ-দুঃখাতীত, তা আত্মার গভীরে। পরমাত্মার সঙ্গে সংযোগ না হলে মানুষ প্রতিটি ঘটনায় বিচলিত হয়, কিন্তু অন্তরে ঈশ্বরচেতনা জাগলে বাইরের ঢেউ মনকে আর সহজে ভাসিয়ে নিতে পারে না।

দৈনন্দিন জীবনে আমরা প্রায়ই এমন অবস্থায় পড়ি যেখানে নিজের পরিকল্পনা ভেঙে যায়। অনেক চেষ্টা করেও ফল মেলে না, আবার কখনো অপ্রত্যাশিত দরজা খুলে যায়। তখন মনে প্রশ্ন আসে— সবকিছু কি সত্যিই আমাদের হাতে? এই প্রশ্নের উত্তরেই শ্রীশ্রীঠাকুরের বাণী নতুন অর্থ পায়। তিনি বোঝান, মানুষ কর্ম করতে পারে, চেষ্টা করতে পারে, কিন্তু ফলের সব সূত্র মানুষের জ্ঞানের মধ্যে নেই। কারণ বৃহত্তর নিয়ন্ত্রণ এক অদৃশ্য শক্তির হাতে। এই উপলব্ধি মানুষকে দুর্বল করে না; বরং অহংকার কমায়। যখন আমরা বুঝতে শিখি যে সবকিছু ব্যাখ্যা করতেই হবে না, তখন অন্তরে এক ধরনের শান্তি জন্মায়। সব না বুঝেও বিশ্বাস করা— এ এক উচ্চতর আধ্যাত্মিক শক্তি।

অনেক সময় আমরা দুঃখকে সম্পূর্ণ অমঙ্গল ভাবি। কিন্তু পরে দেখা যায়, সেই দুঃখই মানুষকে ভেতরে গভীর করেছে, প্রার্থনার দিকে ফিরিয়েছে, অহংকার কমিয়েছে। আবার কিছু সুখ আছে, যা সাময়িক আনন্দ দিলেও পরে আসক্তি বাড়ায়। তাই সুখ-দুঃখের বাইরের ঘটনাকে চূড়ান্ত সত্য ধরে নেওয়া সবসময় সঠিক নয়। পরমাত্মা নির্লিপ্ত— অর্থাৎ তিনি সবকিছুর মধ্যে থেকেও সবকিছুর ঊর্ধ্বে। এই ভাবনা আমাদের শেখায়, জীবনের প্রতিটি অভিজ্ঞতাকে শেষ সিদ্ধান্ত না ভেবে পথের অংশ হিসেবে দেখতে। এতে মন ধীরে ধীরে প্রশান্ত হয়।

আজকের দ্রুতগতির জীবনে মানুষ তথ্যের ভেতর ডুবে থাকলেও অন্তরের স্থিরতা হারিয়ে ফেলছে। সবাই উত্তর চায়, তৎক্ষণাৎ ফল চায়, ব্যাখ্যা চায়। কিন্তু আধ্যাত্মিক জীবন শেখায়— কিছু প্রশ্নের উত্তর নীরবতার মধ্যে আসে, কিছু উপলব্ধি অপেক্ষার মধ্যে জন্মায়। কখনো কখনো না বুঝেও থেমে থাকা, শুধু বিশ্বাসে থাকা— এটাও এক ধরনের সাধনা। যখন মন খুব অস্থির হয়, তখন একটি ছোট প্রার্থনাও মানুষকে বদলে দিতে পারে: “ঠাকুর, আমি সব বুঝতে পারছি না, কিন্তু তোমার ইচ্ছায় বিশ্বাস রাখতে চাই।” এই বাক্যের মধ্যেই আত্মসমর্পণের সূচনা আছে।

অন্তরের দিকে তাকালে বোঝা যায়, আমরা অনেক সময় বাহ্যিক নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভয়ে অস্থির হই। কিন্তু সত্যিকারের শক্তি আসে যখন মানুষ ভেতরে ঈশ্বরের উপস্থিতি অনুভব করতে শেখে। তখন পরিস্থিতি একই থাকলেও প্রতিক্রিয়া বদলে যায়। আগে যা ভেঙে দিত, এখন তা ভাবায়; আগে যা কষ্ট দিত, এখন তা শিক্ষা দেয়। এই রূপান্তর ধীরে ধীরে ঘটে— প্রতিদিন একটু নীরবতা, একটু নামস্মরণ, একটু অন্তরচিন্তা দিয়ে।

শ্রীশ্রীঠাকুরের বাণী তাই শুধু দার্শনিক কথা নয়; এটি জীবনের জন্য ব্যবহারিক আলো। যখন কোনো ঘটনা আমাদের প্রত্যাশামতো না হয়, তখন মনে রাখা যায়— সবকিছু আমার বোধের মধ্যে না এলেও তার ভিতরে কোনো অর্থ আছে। যখন খুব আনন্দ আসে, তখনও মনে রাখা যায়— এটিও ক্ষণস্থায়ী; তাই কৃতজ্ঞ থাকি, কিন্তু আঁকড়ে না ধরি। এই ভারসাম্যই মায়ার মধ্যে থেকেও অন্তরকে আলোকিত রাখে।

শেষ পর্যন্ত মানুষ যা সবচেয়ে বেশি খোঁজে, তা হলো নিশ্চিন্ত আশ্রয়। সেই আশ্রয় কোনো পরিস্থিতি দিতে পারে না, কোনো মানুষও স্থায়ীভাবে দিতে পারে না। কেবল পরমাত্মার প্রতি বিশ্বাসই অন্তরে এমন এক ভিত্তি দেয়, যা পরিবর্তনের মধ্যেও স্থির থাকে। তাই আজকের দিনেও যদি মন বিভ্রান্ত হয়, সবকিছু অস্পষ্ট লাগে, তবে শুধু মনে মনে বলা যায়— “ঠাকুর, আমি বুঝতে না পারলেও তোমার ইচ্ছা বৃথা নয়।” এই প্রার্থনা ধীরে ধীরে মনকে কোমল করে, অন্তরকে দৃঢ় করে, এবং জীবনকে ভিন্ন আলোয় দেখতে শেখায়। যদি এই ভাবনা আপনার অন্তরে স্পর্শ করে, তবে প্রতিদিন অন্তত একবার কিছুক্ষণ নীরবে বসে তাঁর কথা স্মরণ করুন; দেখবেন, অস্থিরতার মাঝেও এক অদৃশ্য শান্তি ধীরে ধীরে নেমে আসছে ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Developed by Jago Desain