স্বামীজী বলতেন— মনকে জয় করতে পারলেই জীবনকে জয় করা যায়

Swami Vivekananda quote about mind control and spiritual discipline

 স্বামীজী বলতেন— মন যদি নিয়ন্ত্রণে আসে, তবে জীবনও নিয়ন্ত্রণে আসে। মানুষের সমস্ত শক্তি, দুর্বলতা, আশা, ভয়, ভালোবাসা, বিভ্রান্তি—সবকিছুর মূলেই আছে মন। এই মন কখনও মানুষকে ঈশ্বরের দিকে টেনে নিয়ে যায়, আবার কখনও সংসারের অস্থিরতার মধ্যে ছুড়ে দেয়। তাই সাধনার প্রথম কাজ বাইরের জগৎকে বদলানো নয়, নিজের মনের ভেতরের অশান্তিকে চিনতে শেখা। কারণ মন শান্ত না হলে বাহ্যিক সাফল্যও অন্তরে শান্তি আনে না। আজকের ব্যস্ত সময়ে আমরা প্রায়ই ভাবি সমস্যার উৎস বাইরে, কিন্তু গভীরে গেলে দেখা যায় অস্থির মনই সমস্ত ক্লান্তির মূল। স্বামীজীর বাণী আমাদের মনে করিয়ে দেয়—জীবনের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ আসে অন্তরের শৃঙ্খলা থেকে।

যখন মন নিয়ন্ত্রণে থাকে না, তখন ছোট একটি কথাতেও আমরা আহত হই, সামান্য ব্যর্থতায় ভেঙে পড়ি, অল্প প্রশংসায় অহংকার জন্মায়, আবার সামান্য অবহেলায় হৃদয় ভারী হয়ে ওঠে। মন একদিকে টানে, বুদ্ধি আরেকদিকে বলে—এই দ্বন্দ্ব থেকেই মানুষের ভিতরে ক্লান্তি জন্মায়। তাই মনের উপর অধিকার প্রতিষ্ঠা মানে কেবল ধ্যান করা নয়, নিজের প্রতিটি প্রতিক্রিয়াকে সচেতনভাবে লক্ষ্য করা। যে মানুষ নিজের মনকে দেখতে পারে, সে ধীরে ধীরে নিজের জীবনকেও বুঝতে শেখে। কারণ প্রতিটি সিদ্ধান্ত আগে মনে জন্মায়, তারপর আচরণে প্রকাশ পায়। মন পবিত্র হলে আচরণ কোমল হয়, বাক্য নম্র হয়, এবং হৃদয় ঈশ্বরের উপস্থিতি অনুভব করতে শুরু করে।
শ্রীশ্রীঠাকুরও বারবার বলতেন, মন যেমন হবে, তেমনি হবে মানুষ। যদি মন সর্বদা ঈশ্বরচিন্তায় সিক্ত থাকে, তবে সংসারের কাজ করেও ভিতরে এক গভীর প্রশান্তি জন্মায়। কিন্তু মন যদি সর্বক্ষণ তুলনা, অভিযোগ, অস্থিরতা আর দুশ্চিন্তায় ভরে থাকে, তবে বাহ্যিক প্রাচুর্যও ভিতরে শূন্যতা তৈরি করে। তাই মনের সাধনা মানে নিজের ভিতরের কথাগুলোকে শুনতে শেখা। কখন মন হিংসায় ভরে উঠছে, কখন অহংকার বাড়ছে, কখন ভক্তি জাগছে—এই সচেতনতা নিজেই এক আধ্যাত্মিক অনুশীলন। মনের উপর জয় হঠাৎ আসে না; প্রতিদিন একটু একটু করে আসে।
আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এই শিক্ষা খুব গভীরভাবে প্রযোজ্য। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর যদি মন উদ্বেগে ভরে যায়, পুরো দিনটিই ভারী লাগে। কিন্তু যদি দিনের শুরুতেই কয়েক মুহূর্ত ঈশ্বরের নাম স্মরণ করা যায়, তবে মন যেন ধীরে ধীরে নিজের কেন্দ্রে ফিরে আসে। সংসারের কাজ, দায়িত্ব, সম্পর্ক—সবই থাকবে, কিন্তু তার মাঝেও মনকে বারবার স্মরণ করাতে হয়—আমি অস্থিরতার দাস নই। যে ব্যক্তি নিজের রাগের মুহূর্তে চুপ থাকতে পারে, দুঃখের মুহূর্তে ধৈর্য ধরতে পারে, আনন্দের মুহূর্তে কৃতজ্ঞ থাকতে পারে—সে-ই প্রকৃত অর্থে মনের উপর কাজ করছে।
আজ মানুষ বাইরের উন্নতির জন্য অসংখ্য পরিকল্পনা করে, কিন্তু অন্তরের প্রশিক্ষণকে গুরুত্ব দেয় কম। অথচ মনকে প্রশিক্ষিত না করলে অর্জনও স্থায়ী আনন্দ দেয় না। মনকে আয়ত্ত করার প্রথম ধাপ হলো নিজেকে দোষ না দিয়ে নিজেকে পর্যবেক্ষণ করা। আজ আমি কেন অস্থির হলাম? কেন একটি কথায় কষ্ট পেলাম? কেন অন্যের সাফল্যে মন সংকুচিত হল? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই ভিতরে আলো জন্মায়। স্বামীজীর শিক্ষা কঠোর, কিন্তু গভীরভাবে মুক্তিদায়ক—নিজেকে জয় না করলে জগৎকে জয় করে লাভ নেই।
ভক্তির পথেও মনই প্রধান সেতু। ঠাকুরের নাম উচ্চারণ করছি, কিন্তু মন অন্যত্র ছুটছে—এ অভিজ্ঞতা সবারই আছে। তাই সাধনা মানে মনকে বারবার ফিরিয়ে আনা। বারবার হারিয়ে গেলেও আবার ফিরিয়ে আনা। এতে হতাশ হওয়ার কিছু নেই, কারণ এই ফেরানোর মধ্যেই সাধনার সৌন্দর্য। মা সারদা দেবীও শিখিয়েছেন—ধীরে ধীরে, কোমলভাবে, ভালোবাসা দিয়ে মনকে ঈশ্বরের দিকে ফেরাতে হয়। মনকে জোরে বেঁধে রাখা যায় না, তাকে প্রেম দিয়ে শুদ্ধ করতে হয়।
অনেক সময় মনে হয় জীবনের সমস্যা এত বেশি যে মন নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব। কিন্তু সত্য হলো, সমস্যা কমে গেলে মন শান্ত হবে—এ নয়; মন শান্ত হলে সমস্যার মধ্যেও পথ দেখা যায়। অন্তরে যদি ঈশ্বরের উপর ভরসা জন্মায়, তবে অনিশ্চয়তার মাঝেও শক্তি আসে। যে মন প্রার্থনা জানে, সে ভেঙে পড়লেও দ্রুত উঠে দাঁড়াতে পারে। কারণ সে জানে—সবকিছু আমার হাতে নয়, কিন্তু আমার মনকে কোন দিকে রাখব, সেটুকু আমার সাধনার অংশ।
এই কারণে প্রতিদিন অল্প সময়ের জন্য হলেও নিজের ভিতরে নীরব হওয়া দরকার। মোবাইলের শব্দ, বাইরের ব্যস্ততা, অসংখ্য খবরের ভিড়—এসবের মাঝেও যদি কয়েক মিনিট নিজের হৃদয়ের দরজা খোলা যায়, তবে বোঝা যায় কত কথা জমে আছে ভিতরে। সেই নীরবতার মধ্যে ঈশ্বরের নাম এক আশ্চর্য শক্তি দেয়। তখন মন একটু একটু করে নম্র হয়, স্থির হয়, আলো গ্রহণ করতে শেখে।
স্বামীজীর বাণী কেবল অনুপ্রেরণার বাক্য নয়, এটি এক জীবনপথ। মনকে আয়ত্ত করা মানে অনুভূতিহীন হওয়া নয়; বরং অনুভূতিকে শুদ্ধ করা। রাগ থাকবে, কিন্তু রাগ আমাকে চালাবে না। দুঃখ আসবে, কিন্তু দুঃখ আমার বিশ্বাস ভাঙবে না। আনন্দ আসবে, কিন্তু আনন্দ অহংকারে পরিণত হবে না। এই ভারসাম্যই আধ্যাত্মিক শক্তি।
আজ অন্তরে একটি ছোট প্রার্থনা জাগুক—ঠাকুর, আমার মনকে শান্ত করো। অস্থিরতার ভিতর তোমার নাম যেন আলো হয়ে থাকে। সিদ্ধান্তের সময় বুদ্ধি দাও, দুঃখের সময় ধৈর্য দাও, আনন্দের সময় কৃতজ্ঞতা দাও। আমার মন যেন বাইরের শব্দে হারিয়ে না গিয়ে তোমার চরণে আশ্রয় খুঁজে পায়। যদি এই কথাগুলো আপনার হৃদয়ে সামান্য আলো জ্বালায়, তবে Ramakrishna Sharanam-এর সঙ্গে থাকুন, কারণ প্রতিটি আধ্যাত্মিক ভাবনা একদিন অন্তরের গভীরে ফল দেয় 🌿🙏

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ব্যাকুলতাই আত্মসাক্ষাতের পথ।

নিরন্তর ঈশ্বরচিন্তায় আত্মজাগরণ: পবিত্র মাতার অমৃতবাণী

অহংকারের কালো মেঘ ও ঈশ্বর উপলব্ধির আলোর পথ।