ছাড়তে না পারার মধ্যেই লুকিয়ে আছে মায়ার গভীর রহস্য
স্বামীজী বলতেন—মানুষ জানে শরীর একদিন থাকবে না, সম্পর্কের রূপ বদলাবে, অর্থ আজ আছে কাল নেই; তবুও মানুষ সেই সবকিছুকেই এমনভাবে আঁকড়ে ধরে যেন এগুলিই চিরস্থায়ী। এই মানবমনের গভীরে যে অদৃশ্য টান কাজ করে, সেটিই মায়া। আমরা জানি পরিবর্তন অনিবার্য, জানি সবকিছু ক্ষণস্থায়ী, তবুও হৃদয় মানতে চায় না। কারণ মায়া কখনও কেবল অজ্ঞতা নয়, অনেক সময় তা অভ্যাস, আসক্তি, ভয় এবং নিজের পরিচয় হারানোর আশঙ্কার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। মানুষ মনে করে, যা সে ধরে রেখেছে—সেটিই তার নিরাপত্তা, সেটিই তার অস্তিত্বের প্রমাণ। অথচ জীবন বারবার দেখিয়ে দেয়, ধরা জিনিস একদিন হাত ফসকে যায়, তবুও মন নতুন করে আবার আঁকড়ে ধরতে শেখে।
এই জগতের সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো—মানুষ সত্য জানার পরেও সেই সত্যের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাঁচতে পারে না। শরীর নশ্বর—এ কথা সবাই জানে, কিন্তু শরীরের সামান্য পরিবর্তনেও ভয় জন্মায়। সম্পর্ক পরিবর্তনশীল—এ কথা বোঝা যায়, তবুও প্রিয় মানুষ দূরে গেলে মন অস্থির হয়ে ওঠে। অর্থের স্থায়িত্ব নেই—এ অভিজ্ঞতা বহুবার হয়, তবুও অর্থ হারানোর আশঙ্কায় রাতের ঘুম নষ্ট হয়। এখানে সমস্যাটি বস্তুতে নয়, সমস্যাটি মনের নির্ভরতায়। মন যখন কোনো কিছুকে স্থায়ী ধরে নেয়, তখন সেই ধারণা ভাঙলেই কষ্ট আসে। স্বামীজীর এই বাণী আমাদের শেখায়—দুঃখের বড় কারণ বাইরের পরিবর্তন নয়, বরং পরিবর্তনকে মেনে নিতে না পারা।
প্রতিদিনের জীবনে আমরা খুব সূক্ষ্মভাবে এই মায়ার প্রকাশ দেখি। কেউ নিজের পরিচয় খুঁজে নেয় পদমর্যাদায়, কেউ অর্থে, কেউ সম্পর্কের মধ্যে, কেউ প্রশংসায়। তাই যখন চাকরি বদলায়, আয় কমে, সম্পর্ক দুর্বল হয়, অথবা মানুষ অবহেলা করে—তখন মনে হয় যেন ভিত কেঁপে উঠেছে। অথচ যদি একটু গভীরভাবে দেখা যায়, তবে বোঝা যাবে—এই সবই জীবনের চলমান স্রোতের অংশ। নদী যেমন এক জায়গায় স্থির থাকে না, তেমনি জীবনও স্থির নয়। কিন্তু মন চায় স্থিরতা, চায় নিশ্চয়তা, চায় যা পেয়েছে তা চিরকাল ধরে রাখতে। এখানেই মায়ার সূক্ষ্ম কাজ—অস্থায়ী জিনিসকে স্থায়ী বলে অনুভব করানো।
মায়া মানে শুধু ভ্রম নয়; মায়া এমন এক শক্তি, যা সত্য জানার পরেও আমাদের ভুলে থাকতে শেখায়। আমরা প্রতিদিন মৃত্যুর খবর শুনি, বিচ্ছেদের কথা দেখি, পরিবর্তনের সাক্ষী হই, তবুও মনে মনে ভাবি—আমার ক্ষেত্রে হয়তো তা হবে না। এই মনোভাব মানুষকে বাস্তব থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। কিন্তু আধ্যাত্মিক দৃষ্টিতে দেখলে, এই উপলব্ধিই মুক্তির শুরু—যেদিন মানুষ বুঝবে, ধরে রাখার মধ্যে শান্তি নেই; বরং গ্রহণ করার মধ্যে শান্তি, সেদিন মন একটু হালকা হবে।
তবে ছেড়ে দেওয়া মানে উদাসীন হয়ে যাওয়া নয়। সম্পর্ক থাকবে, দায়িত্ব থাকবে, ভালোবাসা থাকবে—কিন্তু তার ভিতরে এক গভীর সচেতনতা থাকবে যে সবই ঈশ্বরের ইচ্ছায় এসেছে এবং সময় হলে সরে যাবে। এই ভাবনা হৃদয়কে কঠিন করে না; বরং কোমল করে। কারণ তখন মানুষ অধিকারবোধ কমিয়ে কৃতজ্ঞতা বাড়াতে শেখে। আজ যা আছে, তা আজকের আশীর্বাদ—এই উপলব্ধি এলে ভয় কমে যায়। তখন মানুষ ধরে রাখার চেয়ে যত্ন করতে শেখে, নিয়ন্ত্রণের চেয়ে সমর্পণ করতে শেখে।
নিজের মনকে একটু নিরবে প্রশ্ন করা যায়—আমি আসলে কী হারানোর ভয় করছি? মানুষ? বস্তু? না নিজের তৈরি নিরাপত্তাবোধ? অনেক সময় আমরা জিনিসকে নয়, নিজের অভ্যস্ত অবস্থাকে আঁকড়ে ধরি। তাই পরিবর্তন এলেই অস্থিরতা জন্মায়। অথচ জীবন সবসময় শেখায়—যা বদলাচ্ছে, তা বদলাবেই; কিন্তু অন্তরের গভীরে যে চৈতন্য, যে আত্মা, তা অটল। স্বামীজীর শিক্ষা সেখানেই—বাইরের পরিবর্তনের মধ্যে থেকেও ভিতরের স্থির আশ্রয় খুঁজে নিতে হবে।
যখন মনে হবে কিছু হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে, তখন একটু থেমে অন্তরে বলা যায়—“যা ছিল, তা সময়ের জন্য ছিল; যা যাচ্ছে, তাও তাঁর ইচ্ছায় যাচ্ছে।” এই বাক্য মনকে ধীরে ধীরে প্রশান্ত করে। সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করার প্রয়োজন নেই; সব বুঝে ওঠাও জরুরি নয়। কেবল বিশ্বাস রাখা দরকার—যিনি নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা জীবনটিকেও ধারণ করে আছেন, তাঁর কাছে কিছুই অনিয়ন্ত্রিত নয়।
আজকের দিনে মানুষের সবচেয়ে বড় ক্লান্তি এই আঁকড়ে ধরার মধ্যেই। তাই মাঝে মাঝে একটু ছেড়ে দেওয়া দরকার—অভিমান, ভয়, অতিরিক্ত প্রত্যাশা, নিজের গড়ে তোলা কৃত্রিম পরিচয়। এতে ক্ষতি হয় না; বরং অন্তর স্বচ্ছ হয়। মায়া পুরোপুরি দূর হয়তো একদিনে যায় না, কিন্তু সচেতনতা শুরু হলেই তার বাঁধন আলগা হতে থাকে।
অন্তরে নীরবে প্রার্থনা করা যায়—হে ঠাকুর, যা ক্ষণস্থায়ী তাকে চিরস্থায়ী ভেবে যেন না ধরি। যা চলে যাবে, তাকে আঁকড়ে ধরে যেন নিজেকে ক্লান্ত না করি। তুমি এমন শক্তি দাও, যাতে ভালোবাসি, দায়িত্ব পালন করি, কিন্তু ভিতরে তোমাকেই আশ্রয় করি। কারণ শেষ পর্যন্ত সবকিছু বদলালেও তোমার উপস্থিতিই একমাত্র নির্ভর। যদি এই কথাগুলি হৃদয়ে সামান্য স্পর্শ করে, তবে আজ কিছুক্ষণ নীরবে নিজের মনের দিকে তাকান—আপনি কী আঁকড়ে ধরে আছেন, আর কী আসলে ছেড়ে দিলে মন হালকা হবে।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন