‎তোমার যে-রূপই হোক, হে মহাদেব—সেই রূপেই আমার প্রণাম। ‎

 ‎“হে প্রভু, আমি তোমার প্রকৃত স্বরূপ জানি না।

‎হে মহাদেব, তোমার যে-রূপই হোক,

‎সেই রূপকেই আমি বারংবার প্রণাম জানাই।”

‎এই প্রার্থনার মধ্যে কোনো দাবি নেই, কোনো শর্ত নেই—আছে শুধু এক গভীর আত্মসমর্পণ। মানুষ চায় সংজ্ঞা, চায় রূপ, চায় নাম। কিন্তু ঈশ্বর কি কেবল সংজ্ঞায় ধরা দেন? না কি তিনি সব সংজ্ঞার ঊর্ধ্বে—যেখানে ভাষা থেমে যায়, মন নীরব হয়ে আসে?

‎মহাদেব সেই অনন্ত সত্য, যাঁকে এক নামে বাঁধা যায় না। কখনো তিনি ধ্যানমগ্ন যোগী—চোখ বন্ধ, জগতের সব শব্দ স্তব্ধ। আবার কখনো তিনি তাণ্ডবের নটরাজ—যাঁর নৃত্যে সৃষ্টি ও লয় একসাথে ঘটে। কখনো তিনি শিব—মঙ্গলময়, শান্ত; আবার কখনো ভৈরব—ভয়ংকর অথচ করুণায় পূর্ণ। এই দ্বৈততা নয়, এই হলো পূর্ণতা।

‎মানুষ যখন বলে—“আমি তোমার প্রকৃত স্বরূপ জানি না”—তখন সে আসলে নিজের সীমাবদ্ধতাকেই স্বীকার করে নেয়। এই স্বীকারোক্তিই ভক্তির প্রথম ধাপ। কারণ অহংকার ভেঙে গেলে তবেই হৃদয়ে ঈশ্বরের প্রবেশ ঘটে। আমরা অনেক সময় বলি, “আমার ঈশ্বর এমন”, “আমার বিশ্বাস ওরকম”—কিন্তু সত্যিকারের ভক্তি বলে, “তুমি যেমন, আমি তেমনই মেনে নিই।”

‎মহাদেব কোনো নির্দিষ্ট রূপে আবদ্ধ নন। তিনি শূন্যেও আছেন, পূর্ণতাতেও আছেন। তিনি ধ্বংসে আছেন, সৃষ্টিতেও আছেন। তাই তাঁর কাছে প্রণাম মানে কোনো এক রূপকে নয়—সমগ্র অস্তিত্বকেই প্রণাম জানানো। জীবন যেমন—দুঃখ ও সুখ, লাভ ও ক্ষতি, আলো ও অন্ধকার—সব মিলিয়েই পূর্ণ, তেমনি ঈশ্বরও সব রূপের সমন্বয়।

‎এই প্রার্থনা আমাদের শেখায় গ্রহণ করতে। জীবনে যখন আমরা উত্তর পাই না, পথ অন্ধকার লাগে, তখনও যদি বলতে পারি—“তোমার যে-রূপই হোক, সেই রূপেই প্রণাম”—তাহলেই ভেতরে শান্তি নামে। কারণ তখন আমরা আর ঈশ্বরকে আমাদের ইচ্ছেমতো বদলাতে চাই না; বরং নিজেদের বদলাতে রাজি হই।

‎ভক্তি মানে কেবল ফুল, ধূপ, মন্ত্র নয়। ভক্তি মানে প্রতিটি পরিস্থিতিতে মাথা নত রাখা। সুখ এলে কৃতজ্ঞতা, দুঃখ এলে ধৈর্য—দুটোই প্রণামের রূপ। মহাদেব সেই গুরু, যিনি কথা কম বলেন, কিন্তু নীরবতায় অসীম শিক্ষা দেন। তাঁর ধ্যান আমাদের শেখায়—সব প্রশ্নের উত্তর শব্দে নয়, উপলব্ধিতে।

‎আজকের অস্থির সময়ে এই প্রার্থনা আরও প্রাসঙ্গিক। আমরা সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে চাই—ভবিষ্যৎ, সম্পর্ক, সাফল্য। কিন্তু মহাদেব স্মরণ করিয়ে দেন—নিয়ন্ত্রণ নয়, সমর্পণই মুক্তির পথ। যখন আমরা বলি, “আমি জানি না”—সেদিনই আসলে জানা শুরু হয়।

‎তাই হে মহাদেব, তুমি যেভাবেই প্রকাশিত হও—শান্ত বা রুদ্র, নীরব বা তাণ্ডবময়—আমি সেই রূপেই তোমাকে প্রণাম জানাই। কারণ তোমার প্রতিটি রূপেই লুকিয়ে আছে করুণা, আর তোমার নীরবতাতেই লুকিয়ে আছে অনন্ত

মহাদেবের প্রতি নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের প্রার্থনা—যেখানে কোনো দাবি নেই, আছে শুধু গভীর ভক্তি, নীরবতা ও ঈশ্বরের সকল রূপকে গ্রহণ করার অনুভব।

আশ্বাস।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

অহংকারের কালো মেঘ ও ঈশ্বর উপলব্ধির আলোর পথ।

শেখাই একমাত্র সম্পদ—যা কোনোদিন ব্যর্থ হয় না | স্বামী বিবেকানন্দ