শেখাই একমাত্র সম্পদ—যা কোনোদিন ব্যর্থ হয় না | স্বামী বিবেকানন্দ
শেখা—মানুষের জীবনের এমন এক সম্পদ, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষয় হয় না, বরং আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। মানুষ জীবনে বহু কিছু অর্জন করে—অর্থ, প্রতিষ্ঠা, সামাজিক মর্যাদা, ক্ষমতা। কিন্তু এই সবই পরিস্থিতির সঙ্গে বদলে যেতে পারে। আজ যা আছে, কাল তা নাও থাকতে পারে। ঠিক এই বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েই
স্বামী বিবেকানন্দ দৃঢ় কণ্ঠে বলেছিলেন— “শেখাই একমাত্র সম্পদ—যা কোনোদিন ব্যর্থ হয় না।” এই বাণী কেবল একটি উক্তি নয়; এটি জীবনের জন্য এক চিরস্থায়ী দিশা।
শিক্ষা শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান নয়। প্রকৃত শিক্ষা মানুষের চিন্তাকে শাণিত করে, দৃষ্টিকে প্রসারিত করে এবং চরিত্রকে দৃঢ় করে। যে মানুষ শেখে, সে কেবল তথ্য সংগ্রহ করে না—সে জীবনকে বুঝতে শেখে। জীবনের প্রতিটি অভিজ্ঞতা, সুখ-দুঃখ, সাফল্য-ব্যর্থতা—সবই তার কাছে হয়ে ওঠে নতুন শিক্ষার উপাদান। এই কারণেই শেখা কখনো ব্যর্থ হয় না; কারণ প্রতিটি পরিস্থিতিতেই তা কোনো না কোনোভাবে কাজে আসে।
স্বামী বিবেকানন্দ বিশ্বাস করতেন, মানুষের ভেতরে অসীম শক্তি নিহিত রয়েছে। শিক্ষা সেই শক্তিকে জাগ্রত করে। অশিক্ষা মানুষকে দুর্বল করে, আর শিক্ষা মানুষকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। যে ব্যক্তি শিখেছে কীভাবে চিন্তা করতে হয়, কীভাবে নিজের উপর বিশ্বাস রাখতে হয়, সে প্রতিকূলতার মাঝেও পথ খুঁজে নিতে পারে। বাহ্যিক সহায়তা না থাকলেও তার ভিতরের জ্ঞানই হয়ে ওঠে তার আশ্রয়।
জীবনের কঠিন মুহূর্তগুলোতেই শিক্ষার প্রকৃত মূল্য বোঝা যায়। যখন চাকরি থাকে না, অর্থের অভাব দেখা দেয়, অথবা সমাজের স্বীকৃতি হারিয়ে যায়—তখন কেবল শেখাই মানুষকে নতুনভাবে দাঁড়ানোর শক্তি দেয়। শিক্ষা মানুষকে শেখায় কীভাবে নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে হয়, কীভাবে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়। এই অভিযোজন ক্ষমতাই জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি।
আজকের যুগে আমরা দ্রুত সাফল্যের পিছনে ছুটি। অল্প সময়ে বড় ফল পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা আমাদের গ্রাস করে। কিন্তু এই তাড়াহুড়োর মধ্যে আমরা প্রায়ই শেখার গভীর প্রক্রিয়াকে অবহেলা করি। স্বামীজীর বাণী আমাদের মনে করিয়ে দেয়—যা ধীরে, গভীরে এবং নিষ্ঠার সঙ্গে অর্জিত হয়, সেটাই স্থায়ী। শিক্ষা এমন একটি বিনিয়োগ, যার ফল কখনো নষ্ট হয় না।
শেখা মানুষকে নম্র করে তোলে। যত বেশি শেখা যায়, ততই বোঝা যায়—আমরা আসলে কত অল্প জানি। এই উপলব্ধি অহংকার ভেঙে দেয় এবং হৃদয়ে জন্ম দেয় শ্রদ্ধা ও মানবিকতা। শিক্ষা মানুষকে কেবল নিজের কথা ভাবতে শেখায় না, অন্যের দুঃখ বুঝতে শেখায়। সমাজের জন্য, দেশের জন্য, মানবতার জন্য কাজ করার প্রেরণাও আসে এই শিক্ষা থেকেই।
স্বামী বিবেকানন্দের শিক্ষা আমাদের শেখায় আত্মনির্ভরতার মূল্য। তিনি চাইতেন এমন মানুষ তৈরি হোক, যারা নিজের পায়ে দাঁড়াতে জানে, নিজের চিন্তায় বিশ্বাস রাখে এবং নিজের জ্ঞান দিয়ে সমাজকে আলোকিত করে। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে শিক্ষা কোনো বোঝা নয়—এটি এক মুক্তি, এক শক্তি।
শেষ পর্যন্ত বলা যায়, শেখা হলো এমন এক সাধনা যা মানুষকে বারবার নতুন করে জন্ম নিতে শেখায়। জীবন যতই পরিবর্তনশীল হোক না কেন, শিক্ষা মানুষের সঙ্গে থেকে যায় তার বিশ্বস্ত সঙ্গীর মতো। তাই শেখাই একমাত্র সম্পদ—যা কোনোদিন ব্যর্থ হয় না। এই সত্য আজও যেমন প্রাসঙ্গিক, তেমনি চিরকাল থাকবে।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন