ইন্দ্রিয়জয় ও সাধনার পথ: শ্রী রামকৃষ্ণের বাণীতে ঈশ্বরলাভের রহস্য

 ‎ইন্দ্রিয়জয় করলেই মানুষ সাধু হয়—এই কথাটি শুনতে সহজ মনে হলেও এর অন্তর্নিহিত অর্থ অত্যন্ত গভীর। মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় সংগ্রাম বাইরের জগতের সঙ্গে নয়, বরং নিজের অন্তরের সঙ্গে। কাম, ক্রোধ, লোভ, লালসা—এই প্রবৃত্তিগুলোই মানুষের মনকে অশান্ত করে তোলে এবং ঈশ্বরচিন্তা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। এই সত্যটি বারবার উপলব্ধি করিয়েছেন শ্রী রামকৃষ্ণ।

‎মানুষ সাধারণত ভাবে, সাধু হওয়া মানে সংসার ত্যাগ করা, গেরুয়া বসন পরা বা নির্জনে বসবাস করা। কিন্তু শ্রী রামকৃষ্ণের দৃষ্টিতে সাধুত্ব কোনো বাহ্যিক পরিচয় নয়; এটি একটি অন্তর্গত অবস্থা। যে ব্যক্তি নিজের ইন্দ্রিয়গুলোকে সংযত করতে পারে, যে ব্যক্তি কাম-ক্রোধ-লালসাকে বশে আনতে সক্ষম হয়—তিনিই প্রকৃত অর্থে সাধু। কারণ সংযমই সাধনার ভিত্তি।

‎ইন্দ্রিয় মানে শুধু চোখ, কান বা জিহ্বা নয়—ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে যুক্ত মনই মানুষের আসল শত্রু। মন যখন বিষয়াসক্ত হয়, তখন সে ঈশ্বরকে ভুলে যায়। শ্রী রামকৃষ্ণ বলতেন, মনকে যদি ঈশ্বরের চরণে বেঁধে রাখা যায়, তবে ইন্দ্রিয়গুলো আপনাতেই শান্ত হয়ে আসে। কিন্তু এই বাঁধন সহজ নয়; এর জন্য চাই নিরন্তর সাধনা, সততা ও আত্মপর্যবেক্ষণ।

‎যে ব্যক্তি নিজের কাম-ক্রোধ-লালসাকে বশে এনেছে, তার পক্ষে কি কোনো কিছুই অসম্ভব? এই প্রশ্নের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক অসাধারণ আধ্যাত্মিক সত্য। কারণ ইন্দ্রিয়জয় মানে শুধু নৈতিক সংযম নয়; এটি এক বিশাল মানসিক শক্তির জন্ম দেয়। এই শক্তি মানুষকে দৃঢ়, নির্ভীক ও স্থির করে তোলে। তখন জীবনের দুঃখ-কষ্ট, লোভ-প্রলোভন আর তাকে সহজে টলাতে পারে না।

‎শ্রী রামকৃষ্ণের জীবনের দিকে তাকালেই এই সত্য স্পষ্ট হয়। তিনি নিজে ছিলেন চরম সংযমের মূর্তি। তাঁর জীবন দেখিয়ে দেয়—ইন্দ্রিয়সংযম মানুষকে ছোট করে না, বরং তাকে অসীমের দিকে নিয়ে যায়। যে ব্যক্তি নিজের ভোগবাসনাকে সংযত করতে পারে, সে ধীরে ধীরে অন্তরের শান্তি লাভ করে। আর এই শান্তির মধ্যেই ঈশ্বরের কৃপা প্রবাহিত হয়।

‎ঈশ্বরলাভ মানুষের নিজের শক্তিতে সম্ভব নয়—এ কথা শ্রী রামকৃষ্ণ স্পষ্টভাবে বলেছেন। কিন্তু ইন্দ্রিয়জয় মানুষের মনকে সেই অবস্থায় পৌঁছে দেয়, যেখানে ঈশ্বরের কৃপা সহজে অবতরণ করতে পারে। ঠিক যেমন পরিষ্কার পাত্রেই বিশুদ্ধ জল রাখা যায়। অশান্ত, বিষয়াসক্ত মন ঈশ্বরচিন্তার যোগ্য পাত্র নয়।

‎আজকের আধুনিক জীবনে এই শিক্ষা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। চারপাশে ভোগের আহ্বান, দ্রুত সুখের প্রতিশ্রুতি, অবিরাম ব্যস্ততা—সবকিছু মিলিয়ে মন ক্রমশ অস্থির হয়ে উঠছে। এই সময়ে শ্রী রামকৃষ্ণের বাণী আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—সত্যিকারের শক্তি বাহ্যিক সাফল্যে নয়, অন্তরের সংযমে।

‎ইন্দ্রিয়জয় মানে জীবন থেকে আনন্দ সরিয়ে দেওয়া নয়; বরং নিম্ন আনন্দের বদলে উচ্চ আনন্দের দিকে যাত্রা। যখন মন ঈশ্বরমুখী হয়, তখন এক গভীর, নিঃশব্দ আনন্দ অনুভূত হয়—যা কোনো ইন্দ্রিয়সুখ দিতে পারে না। এই আনন্দই সাধনার ফল, এই আনন্দই ঈশ্বরলাভের পূর্বলক্ষণ।

‎শেষ পর্যন্ত শ্রী রামকৃষ্ণ আমাদের যে পথ দেখিয়েছেন, তা কঠিন হলেও কল্যাণময়। ইন্দ্রিয়জয়, আত্মসংযম ও ঈশ্বরের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরতা—এই তিনের সমন্বয়েই সাধনার পূর্ণতা। ঈশ্বরের কৃপায় তখন মানুষ শুধু নিজেকে নয়, সমগ্র জীবনকেই আলোকিত কর


তে পারে।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

অহংকারের কালো মেঘ ও ঈশ্বর উপলব্ধির আলোর পথ।

‎তোমার যে-রূপই হোক, হে মহাদেব—সেই রূপেই আমার প্রণাম। ‎

শেখাই একমাত্র সম্পদ—যা কোনোদিন ব্যর্থ হয় না | স্বামী বিবেকানন্দ